ড. মোঃ এনায়েত হোসেন | বুধবার, ২৬ নভেম্বর ২০২৫ | প্রিন্ট
সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনে শিক্ষার ভুমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ । শিক্ষা সমাজের একটি অপরিহার্য্য উপাদান। শিক্ষা জাতির অগ্রগতি ও সমৃদ্ধির মূল উৎস। আত্মসচেতন দক্ষ জনশক্তি সৃষ্টির উত্তম হাতিয়ার হল শিক্ষা। জাতীয় জীবনে গৌরবময় ঐতিহ্য রচনায় শিক্ষা সর্বাপেক্ষা কার্যকর এবং বলিষ্ঠ সক্রিয় শক্তি। শিক্ষা একটি গতিশীল প্রক্রিয়া। সমাজের চাহিদা পুরণে যুগে যুগে শিক্ষা তার লক্ষ্য -উদ্দেশ্যের গতিপথ বার বার পরিবর্তন করেছে। শিক্ষার ধারনার ন্যায় শিক্ষার লক্ষ্য-উদ্দেশ্যও সমাজ পরিক্রমায় বিভিন্নরূপ ও মাত্রা লাভ করেছে। শিক্ষার একক কোন লক্ষ্য-উদ্দেশ্য সার্বজনীন ও চিরস্থায়ী হয়ে ওঠেনি, সেটা হওয়া সম্ভবও নয়। শিক্ষার ধারনার মধ্যেই শিক্ষার লক্ষ্য-উদ্দেশ্যের মর্ম কথা নিহিত রয়েছে। কাল,সমাজ বাস্তবতা এবং ভবিষ্যৎ সমাজ নির্মাণ অথবা পুণর্গঠনের প্রেক্ষিতে শিক্ষার লক্ষ্য-উদ্দেশ্য বিশেষ বৈশিষ্ট অর্জন করেছে। মানুষের জীবন ও সমাজ চাহিদার নিরিখে শিক্ষার লক্ষ্য-উদ্দেশ্য নির্ধারিত হয়। নতুন নতুন চাহিদার প্রেক্ষিতে তা আবার পরিবর্তিতও হয়।
লক্ষ্য শব্দের শাব্দিক অর্থ অভিপ্রেত বা কাম্য বস্তুর প্রতি দৃষ্টি, নিশানা,উদ্দেশ্য,মনোযোগের বিষয়,নজর। কিন্তু ব্যবহারিক অর্থে লক্ষ্য হল একটি প্রত্যাশিত অবস্থা যেখানে সকলেই পৌছঁতে চায়। শিক্ষার লক্ষ্য হল কতগুলো আদর্শিক নির্ণয়কের সমষ্টি নির্ধারণ যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের গড়ন, বিকাশ, প্রজ্ঞানুশীলনে সংশ্লিষ্ট সকলকে নির্দেশ দেয়। শিক্ষার মূল লক্ষ্য শিশুর দৈহিক, মানসিক,সামাজিক,নৈতিক ও আধ্যাত্মিক গুণাবলির বিকাশের মাধ্যমে জীবন সমস্যা সমাধান ও সৃজন শক্তির বিকাশ। প্রয়োগিক দিক বিবেচনায় শিক্ষার লক্ষ্য দু ধরণেরঃ নিকটবর্তী ও দূরবর্তী। নিকট ভবিষ্যতে শিক্ষা ক্ষেত্রে যে সব পরিবর্তন সংগঠিত হবে সেগুলোই হল নিকটবর্তী লক্ষ্য। যেমন একটি পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় নির্ধারিত শিক্ষার উদ্দেশ্যগুলো হল নিকটবর্তী লক্ষ্য। আর একাধিক পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় মধ্যবর্তী সময়ে গৃহীত পরিপ্রেক্ষিত পরিকল্পনার লক্ষ্যসমূহ হল দূরবর্তী লক্ষ্য। দূরবর্তী লক্ষ্যকে আবার অনেকে অভিলক্ষ্য(Goal) বলে থাকেন।
প্রাচীন ও মধ্যযুগে সমাজের উচ্চতর শ্রেণির মানুষের জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কাঠামো ভিত্তিক শিক্ষার ব্যবস্থা থাকলেও সাধারণ মানুষের জন্য সে সুযোগ ছিল না। পরিবারই সাধারণ মানুষের শিক্ষা লাভের প্রধান প্রতিষ্ঠান হিসেবে ভুমিকা পালন করতো। ফলে সাধারণ মানুষের জন্য শিক্ষার সুসংবদ্ধ লক্ষ্য মধ্যযুগ পর্যন্ত অধিকাংশ ক্ষেত্রে গড়ে ওঠেনি। অস্ট্রেলিয়ান শিক্ষাবিদ কার্ল কোনিগের(১৯২০-১৯৬৬ খ্রি.)মতে মধ্যযুগে আরবদের মধ্যে প্রথম পার্থিব শিক্ষার বীজ রোপিত হয়। ইউরোপের কিছু অংশ এর দ্বারা প্রভাবিত হয়।
শাব্দিক অর্থে উদ্দেশ্য বলতে বোঝায় অভিপ্রায়,লক্ষ্য, অন্বেষণ, খোজঁ,সন্ধান,মতলব,বার্তা,সংবাদ,ঠিকানা,স্মরণ, তাৎপর্য। কিন্তু শিক্ষা মানুষকে কী রকমের মানুষ হতে সহায়তা করবে তার চিত্রায়নই শিক্ষার উদ্দেশ্য। শিক্ষা মূলত মানুষ ও তার নিজের চতুর্পার্শ্বকে পদ্ধতিগতভাবে জানার সুযোগ করে দেয়। দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য, মূল্যবোধ,বিশ্বাসের আলোকে প্রণীত হয় শিক্ষার দর্শন। শিক্ষা দর্শনের উপর ভিত্তি করে শিক্ষা কমিশন গঠিত হয় যা পরবর্তী পর্যায়ে শিক্ষার পরিকল্পনা ও শিক্ষা কাঠামো নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখে। এগুলোর উপর নির্ভর করে নির্মিত হয় শিক্ষার লক্ষ্য। আর লক্ষ্যকে কেন্দ্র করে ধীরে ধীরে পল্লবিত হয় শিক্ষার উদ্দেশ্য।
প্রাগৈতিহাসিক যুগে শিক্ষার সুনির্দিষ্ট কোন লক্ষ্য-উদ্দেশ্য না থাকলেও কালক্রমে সভ্য সমাজে শিক্ষা একটি বিশেষ প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। অগ্রসর সমাজের শিক্ষাব্যবস্থা প্রায় সম্পূর্ণই আনুষ্ঠানিক। সাধারণত আনুষ্ঠানিক শিক্ষা এক বা একাধিক লক্ষ্য-উদ্দেশ্য নিয়ে পরিচালিত হয়। প্রাচীন সভ্যতা থেকে বর্তমান পর্যন্ত প্রতিটি সমাজ বা রাষ্ট্রে শিক্ষা ব্যবস্থা কোন না কোন লক্ষ্য সামনে রেখে তার কার্যাবলি সম্পন্ন করে। বিভিন্ন সময়ে ব্যক্তি সমাজ ব্যবস্থায় পরিবর্তন ঘটিয়েছে এবং এই পরিবর্তনের মাধ্যম হিসেবে শিক্ষার লক্ষ্যও পরিবর্তিত হয়েছে। আদিম যুগে খাদ্য সংগ্রহ ও নিাপত্তার কৌশল আয়ত্ত করা ছিল শিক্ষার লক্ষ্য। আত্মোপোলব্ধি,পার্থিব দুঃখ ও শোকতাপ থেকে মুক্তি লাভ করা ছিল প্রাচীন যুগের শিক্ষার লক্ষ্য। মধ্যযুগের শিক্ষার লক্ষ্য ছিল ধর্মীয় রীতিনীতি কঠোরভাবে মেনে চলা। আধুনিক যুগে ব্যক্তির সার্বিক বিকাশ ও সামাজিক কল্যাণ সাধন করা শিক্ষার লক্ষ্য।
শিক্ষার লক্ষ্য নিয়ে শিক্ষা দার্শনিকদের দৃষ্টি ভঙ্গি পর্যালোচনা করে নিম্নলিখিত অভিমত পরিলক্ষিত হয় ঃ
পীথাগোরাসের(৫৭০-৪৯৫ খ্রি.পূ.) মতে, শিক্ষার লক্ষ্য, “ আত্মার শুদ্ধি ও পরিপূর্ণতা অর্জন”। “ গণিত ও সঙ্গীতের মাধ্যমে জগতের সুষমা ও সামঞ্জস্য বোঝা”। “ জ্ঞানকে নৈতিক উন্নয়নের মাধ্যম হিসেবে দেখা”।
সক্রেটিসের (৪৬৯-৩৯৯ খ্রি.পূ.) মতে, শিক্ষার লক্ষ্য “ নৈতিক জ্ঞান ও আত্ম-জ্ঞান(Self-knowledge) অর্জন”। “ মানুষকে নিজের অজ্ঞানতা বুঝতে সাহায্য করা- শহড়ি : যুংবষভ”। “ যুক্তি, প্রশ্নোত্তর ও চিন্তার মাধ্যমে সত্যের সন্ধান করা (Socratic Method)”।
প্লেটোর(৪২৭-৩৪৭ খ্রি.পূ.) মতে, শিক্ষার লক্ষ্য হল,“সত্য,সুন্দর ও কল্যাণের অনুসন্ধান”। “ব্যক্তির আত্মার বিকাশ ও সমাজের আদর্শ নাগরিক তৈরি করা”। শিক্ষার উদ্দেশ্য হল,“মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোয় অর্থাৎ অজ্ঞতা থেকে জ্ঞানে উত্তরণ করানো”।
এরিস্টটলের(৩৮৪-৩২২ খ্রি.পূ.) মতে, ” ব্যক্তির সর্বাঙ্গীণ বিকাশ ঘটানো-শারীরিক,মানসিক,নৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক দিক থেকে ”। ” মানুষকে সৎ, যুক্তিবাদী ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা”। ” শিক্ষার মাধ্যমে এমন জীবন গঠন করা, যাতে সে সদগুণ চর্চা করে সুখী ও নৈতিক জীবনযাপন করতে পারে”। “ শিক্ষা হবে বাসÍবজীবন মুখী ও অভিজ্ঞতা নির্ভর”।
আবু হামিদ মোহাম্মদ আল গাজ্জালী (১০৫৮-১১১১ খ্রি.)। যিনি ইমাম গাজ্জালী নামে সমধিক পরিচিত। তাঁর মতে শিক্ষার লক্ষ্য “ আল্লাহর নৈকট্য অর্জন ও আত্মশুদ্ধি”। “ জ্ঞান অর্জনের উদ্দেশ্য হবে কেবল পার্থিব লাভ নয়,বরং আখেরাতের মুক্তি”। “ নৈতিক, আধ্যাত্মিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক উন্নয়ন ঘটানো”। “ জ্ঞানের মাধ্যমে মানুষের মধ্যে আল্লাহ ভীতি, ন্যায় পরায়নতা ও মানব কল্যাণ বোধ গড়ে তোলা”। ইমাম গাজ্জালীর একটি বিখ্যাত বানী এ ক্ষেত্রে খুবই গুরুত্ব বহন করে, “মান আরাফা নাফসাহু, ফাকদ আরাফা রব্বাহু”। যে ব্যক্তি নিজেকে চিনলো, সে তার প্রভু আল্লাহকে চিনলো”।
ইবনে খালদুন(১৩৩২-১৪০৬) এর মতে, শিক্ষার লক্ষ্য,“ সমাজ ও সভ্যতার উন্নয়নে ব্যবহারিক জ্ঞান অর্জন”। “ বুদ্ধিবৃত্তিক, নৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন ঘটানো”।“ শিক্ষার মাধ্যমে মানুষকে কর্মক্ষম ও বাস্তব জীবনে উপযোগী করে তোলা”।
বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের (১৮৬১-১৯৪১ খ্রি.) মতে শিক্ষার লক্ষ্য,“ সুশিক্ষার লক্ষণ এই যে, তাহা মানুষকে অভিভুত করে না, তাহা মানুষকে মুক্তিদান করে। আমাদের যে শক্তি আছে তাহারই চরম বিকাশ হইবে, আমরা যাই হইতে পারি তাহাই সম্পূর্ণভাবে হইব-ইহাই শিক্ষার ফল”।
মহাত্মা গান্ধী [মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী-১৮৬৯-১৯৪৮] বুনিয়াদি শিক্ষার প্রবর্তক। তাঁর মতে শিক্ষার লক্ষ্য, “ দেহ, মন ও আত্মার পরিপূর্ণ বিকাশ এবং চরিত্র গঠন”। তিনি মনে করতেন,“ শিক্ষা একটি চলমান প্রক্রিয়া,যার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা স্বনির্ভর হবে এবং তাদের মধ্যে আধ্যাত্মিক চেতনা জাগবে। শিক্ষা উৎপাদনশীল এবং সমাজ জীবনের সাথে যুক্ত হওয়া উচিত”।
ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর (১৮৮৪-১৯৬৯) মতে,“ শিক্ষার লক্ষ্য হওয়া উচিত মানুষকে উন্নত ও সহনশীল করে তোলা,যাতে তারা জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ও সহনশীল হতে পারে। তিনি এমন একটি উন্নত শিক্ষাব্যবস্থা চেয়েছিলেন যা মানুষের মধ্যেকার অনৈক্য ও বিভেদ দূর করতে পারে”।
জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় রেখে আধুনিককালে বাংলাদেশের শিক্ষার নিম্নরূপ লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়
১. শিক্ষার বৃত্তিমূলক লক্ষ্যঃ শিক্ষা,খাদ্য, বাসস্থান, চিকিৎসা এবং বস্ত্র মানুষের মৌলিক চাহিদা। শিক্ষার আধুনিক লক্ষ্য হল এসব মৌলিক চাহিদা মেটানোর প্রয়োজনে কর্ম বা বৃত্তি লাভের উপযোগী দক্ষ মানব সম্পদ সৃষ্টি করা। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বিকাশের ধারায় শিল্পায়নের প্রয়োজনীয়তা শিক্ষার বৃত্তিমূলক লক্ষ্যকে জোরদার করেছে। কখনো কখনো এটিকে শিক্ষার রুটি ও মাখন লক্ষ্য(bread and butter aim of education) বলা হয়। দেশের নাগরিককে জীবিকা নির্বাহের উপযুক্ত করে গড়ে তোলাই শিক্ষা ব্যবস্থার প্রধান লক্ষ্য হওয়া যুক্তিযুক্ত।
২. শিক্ষার জ্ঞানমূলক লক্ষ্যঃ সক্রেটিস জ্ঞানার্জনকে শিক্ষার প্রধান লক্ষ্য হিসেবে গণ্য করেছেন। জ্ঞান মানুষের চিন্তা শক্তির বিকাশ সাধন করে। শিক্ষার লক্ষ্য হল ব্যক্তিকে অন্ধকার থেকে আলোর পথে নিয়ে যাওয়া। তাই শিক্ষার মূল লক্ষ্য হল ব্যক্তিকে জ্ঞান লাভের ব্যবস্থা করা। শিক্ষার লক্ষ্য কেবল মাত্র জ্ঞান আহরণই নয় বরং জ্ঞান আহরণের পদ্ধতি গুলো সঠিকভাবে আয়ত্ত করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সেগুলোর ব্যবহার করা।
৩. শিক্ষার সাংস্কৃতিক লক্ষ্যঃ শিক্ষার সাংস্কৃতিক লক্ষ্য হচ্ছে শিক্ষার্থীকে মার্জিত ও রুচিশীল করা এবং সুন্দর ও সত্যের অনুরাগী করা।
৪. শিক্ষার নৈতিক চরিত্রগঠনমূলক লক্ষ্যঃ অনেক শিক্ষাবিদ মনে করেন শিক্ষার্থীর নৈতিক চরিত্র গঠনই শিক্ষার প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত। জার্মান শিক্ষাবিদ জোহান ফ্রিডারিক হার্বার্টের মতে(১৭৭৬-১৮৪১ খ্রি.) মতে, শিক্ষার্থীদের চরিত্র গঠন হচ্ছে শিক্ষার প্রধান লক্ষ্য।
৫. শিক্ষার পূর্ণাঙ্গ জীবন যাপনমূলক লক্ষ্যঃ অনেক শিক্ষাচিন্তাবিদ ব্যক্তির সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবন যাপনের জন্য দৈহিক,মনস্তাত্তিক, সামাজিক-সাংস্কৃতিক বিকাশ সাধনকে শিক্ষার লক্ষ্য হিসেবে গণ্য করেন। তাঁদের মতে এটিই হচ্ছে শিক্ষার পূর্ণাঙ্গ জীবন যাপনমূলক লক্ষ্য।
৬. ব্যক্তি ও জাতীয় মূল্যবোধের পুনঃপ্রতিষ্ঠা ঃ সাম্প্রতিক সমাজ জীবনে বাংলাদেশ যে সমস্যার সম্মুখীন, তার মূলে রয়েছে মূল্যবোধের অবক্ষয়। ব্যক্তি ও জাতীয় জীবনে মূল্যবোধের পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রয়োজনই শিক্ষা অর্জনের লক্ষ্য হওয়া উচিত।
৭. অবকাশ যাপনের জন্য শিক্ষাঃ কোন কোন শিক্ষাবিদ অবকাশ যাপনকে শিক্ষার লক্ষ্য হিসেবে বিবেচনা করেছেন। তাঁরা অবকাশকে মুক্ত ও ব্যস্ততাহীন সময় বলে গণ্য করার মাধ্যমে এর সদ্ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন। এ সব শিক্ষাবিদের মতে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির ফলে ক্রমেই মানুষের দৈহিক শ্রম কমে যাচ্ছে। ফলে মানুষ অলসে পরিণত হচ্ছে। শিক্ষাবিদগণ অবকাশ যাপনের লক্ষ্যকেন্দ্রিক শিক্ষার পরিকল্পনার সুপারিশ করেছেন। খেলাধুলা,শরীরচর্চা,বিতর্ক,ভ্রমণ,নাটক, প্রভৃতি সহ-শিক্ষাক্রমিক কর্মকান্ডের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। এর ফলে শিক্ষার্থীদের দেহ ও মনের সুষম বিকাশ ঘটবে।
৮. আত্মিক উন্নয়নে শিক্ষার লক্ষ্যঃ স্বামী বিবেকান্দ,মহাত্মা গান্ধী, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, রাধাকৃষ্নান প্রমুখ আধুনিক কালের মনীষীগণও শিক্ষার আত্মিক উন্নয়নের কথা বলেছেন। শিক্ষা চিন্তাবিদগণ শিক্ষার মাধ্যমে আত্মিক শক্তিতে শিক্ষার্থীদেরকে উজ্জীবিত করার উপর এতই জোর দিয়েছেন যে, বস্তুগত জগত যেন কখনই মানুষ,মানবতা ও বস্ত বহিঃভূর্ত চিরায়ত বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণ না করতে পারে। মনের জীবনের সর্বজনীন উপলব্ধি এবং পরিবর্তনশীল সমাজের সাথে আত্মিক বন্ধনকে সুদৃঢ় করাই শিক্ষার মূল লক্ষ্য।
৯. ব্যক্তির বিকাশের লক্ষ্যে শিক্ষাঃ ব্যক্তি হলো শিক্ষার কেন্দ্রবিন্দু। আধুনিক শিক্ষা দর্শনে শিক্ষার্থীদের ব্যক্তি সত্তা বিকাশের ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়। শিক্ষার্থীদের ব্যক্তি স্বাতন্ত্রবোধ জাগ্রত করা এবং তাকে আত্মসত্তার আস্থাবান করে তোলাই শিক্ষার প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত বলে আধুনিক শিক্ষাবিদগণ মনে করেন। ব্রিটিশ শিক্ষাবিজ্ঞানী স্যার টমাস পারসি নান [SIR THOMAS PERCY NUNN-১৮৭০-১৯৪৪ খ্রি.] শিক্ষার লক্ষ্য হিসেবে ব্যক্তির বিকাশকে অধিকতর গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি(পারসি নান) মনে করেন,“ ব্যক্তি নিজেই তার ভাগ্য গড়ার স্থপতি”।
১০. সামাজিক দক্ষতা বিকাশের লক্ষ্যে শিক্ষাঃ শিক্ষার্থীকে ভবিষ্যত সমাজের জন্য উপযুক্ত নাগরিক এ পরিণত করা শিক্ষার সামাজিক লক্ষ্য। সামাজিক সচেতনতা, অর্থনৈতিক সামর্থ এবং সাংস্কৃতিক ও নৈতিক মান বৃদ্ধির সমষ্টিই হচ্ছে সামাজিক দক্ষতা। শিক্ষার লক্ষ্য হবে সমাজের কল্যাণে ব্যক্তিকে আত্মদানে উদ্বুদ্ধ করা। এ প্রসঙ্গে শিক্ষা বিজ্ঞানী কে.এম.এস.রস [K.M.S. ROSS]এর উক্তি, “ সমাজের চাহিদার আলোকেই শিক্ষার লক্ষ্য নির্ধারিত হওয়া উচিত। ব্যক্তির নিজস্ব পছন্দের বিষয়টি এ ক্ষেত্রে মুখ্য বিবেচ্য নয়। প্রাচীন গ্রিক নগর রাষ্ট্র স্পার্টায় রাষ্টের স্বার্থেই ব্যক্তি শিক্ষার্জন করতো। স্পার্টার [প্রাচীন গ্রীসের] বিখ্যাত মনীষী লাইকারজাস (Lycergus-৭৩০ খ্রি.পূর্ব) বলেছিলেন,“ স্পার্টায় মানুষ নিজের জন্য জন্মায় না, জন্মায় তার রাষ্ট্রের জন্য”।
১১. শিক্ষার গণতান্ত্রিক লক্ষ্য ঃ গণতন্ত্রের মূল ধারণা হলো সাম্য-মৈত্রী-স্বাধীনতা। শিক্ষায় গণতান্ত্রিক লক্ষ্যের মূল কথা হলো সবার সমান অধিকার,ন্যায়,স্বাধীন চিন্তা ও কাজের সুযোগ, মত প্রকাশের অধিকার ইত্যাদি। এই লক্ষ্যের দ্বারা প্রত্যেক শিক্ষার্থীর ব্যক্তিত্বের বিকাশ সাধন করা স¤ভব হয়। শিক্ষার্থীর অন্তর্নিহিত দক্ষতা ও সামর্থের বিকাশ সাধন করা সম্ভবপর হয়। সমাজের অগ্রগতির জন্য প্রত্যেক শিক্ষার্থীর সমান অংশগ্রহণ সুনিশ্চিত করা হয়। এই লক্ষ্যের দ্বারা দেশকে নেতৃত্ব দেবার মানসিকতা সম্পন্ন শিক্ষার্থী তৈরি সম্ভব হয়। শিক্ষার্থীর মধ্যে এই ধারণা ও অনুভুতি,বোধ জাগ্রত হয় যে ধর্ম,বর্ণ,অর্থ,কৃষ্টি,জাতি,সম্প্রদায় নির্বিশেষে দেশের প্রতি প্রতিটি শিক্ষার্থীর অধিকার ও কর্তব্য সমান।
১২. শিক্ষার আধুনিক লক্ষ্য ঃ ব্যক্তিতান্ত্রিক লক্ষ্য ও সমাজতান্ত্রিক লক্ষ্যের সমন্বয় হলো আধুনিক শিক্ষার লক্ষ্য। আমেরিকান দার্শনিক,শিক্ষা বিজ্ঞানী জন ডিউই(১৮৫৯-১৯৫২ খ্রি.) এ ধারণার প্রবক্তা। তিনি মনে করেন, গণতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্য দিয়ে শিক্ষায় ব্যক্তিতান্ত্রিক ও সমাজতান্ত্রিক লক্ষ্যের সমন্বয় সাধিত হতে পারে। গণতান্ত্রিক শিক্ষার লক্ষ্য ব্যক্তিকে আদর্শ মানুষ রূপে গঠন করা এবং সুনাগরিকরূপে গড়ে তোলা। প্রকৃত পক্ষে গণতন্ত্রই সমাজের মধ্যে ব্যক্তি বিকাশের সুযোগ দিয়ে থাকে। সামাজিক যোগ্যতা অর্জনই গণতান্ত্রিক শিক্ষার লক্ষ্য। উল্লেখ করা যেতে পারে যে, জন ডিউইকে [John Dewey] প্রগতিশীল শিক্ষার বা আধুনিক শিক্ষার জনক বলা হয়। তিনি সামাজিক শিক্ষার একজন সমর্থক ছিলেন।
১৩. বিশ্বভ্রাতৃবোধ সৃষ্টির জন্য শিক্ষার লক্ষ্য ঃ একুশ শতকে প্রযুক্তির অভাবনীয় অগ্রগতির ফলে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ ও জাতির মানুষের মধ্যে নিবিড় যোগাযোগ ব্যবস্থা সুগম হয়েছে। তাই পৃথিবীকে এখন বিশ্বগ্রাম হিসেবেও আখ্যায়িত করা হয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে শিক্ষার লক্ষ্য হিসেবে বিশ্বভ্রাতৃবোধ সৃষ্টির ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হচ্ছে। বিশ্বায়নের যুগে শিক্ষার লক্ষ্যকে শুধু রাষ্ট্রীয় জাতীয়তাবোধে উদ্বুদ্ধ করে সুনাগরিক সৃষ্টির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা সমীচীন নয়। বিভিন্ন দেশ ও সমাজের মানুষের মধ্যে সহমর্মিতা ও সমঝোতার মনোভাব জাগ্রত করার মাধ্যমে দ্বন্দ্ব সংঘাত হ্রাস করে বিশ্বে শান্তিময় পরিবেশ সৃষ্টিই এখন শিক্ষার প্রধান লক্ষ্য হওয়া অধিকতর যুক্তিযুক্ত।
১৪. বর্তমান বিশ্বে শিক্ষার লক্ষ্যঃ বর্তমান বিশ্ব তথা একবিংশ শতকে শিক্ষা আর পূর্বের জায়গায় নেই। শিক্ষা তার অবস্থান প্রতিনিয়ত পরিবর্তন করছে। বর্তমান বিশ্বে দেখা যাচ্ছে জ্ঞানের প্রকৃত ব্যবহারের অভাব। তাত্তিক্ব জ্ঞান দ্বারা আর জীবন ধারণ সম্ভব নয়। ফলে একবিংশ শতকে এসে শিক্ষার লক্ষ্য মূলত এমন একজন ব্যক্তি তৈরি করা যে তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক উভয় প্রকার জ্ঞানেই দক্ষ হবে। শিক্ষায় থাকতে হবে তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক জ্ঞানের সমন্বয়। এই সমন্বিত জ্ঞানের আলোকে সে সমাজে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে সবার সাথে সহবস্থান করবে। এভাবেই সে প্রকৃত মানুষ হয়ে ওঠবে। ১৯৯৬ খ্রি. ইউনেসকোর [UNESCO] উদ্যোগে প্যারিসে এক আন্তর্জাতিক শিক্ষা সম্মেলনে ফরাসী শিক্ষাবিদ জ্য্ক্সা ডেলরের [JACQUES DELORS- ১৯২৫-২০২৩] নেতৃত্বে একটি কমিশন গঠিত হয় যা ডেলর কমিশন[ DELORS COMMISSION-১৯৯৬] নামে সুপরিচিত। এই কমিশনের প্রতিবেদনে শিক্ষার দক্ষতা ভিত্তিক চারটি স্তম্ভের কথা বলা হয়।
শিক্ষার স্তম্ভগুলো হলোঃ
ক. জানার জন্য শিখা (Learning to Know)
খ. কর্মের জন্য শিখা (Learning to Do)
গ. একত্রে বসবাসের জন্য শিখা (Learning to Live Together)
ঘ. মানুষ হতে শিখা (Learning to Be)।
এই কমিশনের প্রধান সুপারিশ ছিল- শিক্ষা হবে জীবনব্যাপী এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক।
২০০৩ খ্রি.অধ্যাপক মুহাম্মদ মনিরুজ্জামান মিঞা জাতীয় শিক্ষা কমিশন প্রতিবেদনে বাংলাদেশের শিক্ষার লক্ষ্য-উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলা হয়, “শিক্ষার মূল লক্ষ্য জনগোষ্ঠিকে স্বল্প সময়ের মধ্যে সম্পদে পরিণত করা”।
শিক্ষার লক্ষ্য সমাজের চাহিদার সাথে সাথে পরিবর্তিত হয়। শিক্ষার লক্ষ্যের ধারা পরিবর্তিত হয় সমাজের চাহিদার সাথে। শিক্ষার প্রকৃত লক্ষ্য হল ব্যক্তিকে অন্ধকার থেকে আলোর পথে নিয়ে আসা এবং ব্যক্তিকে বিজ্ঞানসম্মত ও যৌক্তিক মানসিকতা সম্পন্ন করে তোলা। শিক্ষার লক্ষ্য হল মানুষকে কর্মক্ষম ও প্রকৃত মানুষ হবার শিক্ষা দেয়া। বাংলাদেশের বর্তমান সমাজ প্রেক্ষাপটে অর্থাপোর্জনকেই শিক্ষার প্রধান লক্ষ্য হিসেবে বিবেচনা হরা হয়। শিক্ষার জাগতিক লক্ষ্যের পাশাপাশি নৈতিক ও আধ্যাত্মিক লক্ষ্য অর্জনই হতে পারে সাফল্যের একমাত্র উপায়। উন্নত সমাজ ও কল্যাণ রাষ্ট্র গঠনে নৈতিক গুণাবলী সম্পন্ন নাগরিক তৈরি অপরিহার্য। নৈতিক শিক্ষা বিশ্বায়নের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় দক্ষ ও উপযুক্ত নাগরিক তৈরিতে সহায়ক ভুমিকা রাখতে পারে। শিক্ষার কাঙ্খিত লক্ষ্য হবে সুনাগরিক তৈরি করে তাকে জনসম্পদে পরিণত করা।
পরিশেষে আমরা বলতে পারি সমাজ,রাষ্ট্র ও মানবকল্যানে শিক্ষার লক্ষ্য হবে-জানার জন্য শিখা, কর্মের জন্য শিখা, সমাজে একত্রে বসবাসের জন্য শিখা এবং প্রকৃত মানুষ হতে শিখা।
লেখকঃ ড. মোঃ এনায়েত হোসেন, শিক্ষাবিদ,গবেষক, গণমাধ্যম ও মানবাধিকার কর্মী।
Posted ১১:২৯ পূর্বাহ্ণ | বুধবার, ২৬ নভেম্বর ২০২৫
dainikbanglarnabokantha.com | Romazzal Hossain Robel
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।